সংবাদপত্র ডিজিটাল নিউজ ডেস্ক , ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ :
২০ সেপ্টেম্বর কলকাতার ‘ইনকিলাব সমাবেশ’-এর প্রচারে দিনহাটার দেওয়ালে উঠেছে পাঁচটি স্থানীয় দাবি—কলেজ, স্টেডিয়াম, কর্মসংস্থান, গীতালদহে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং গোসানিমারিতে পর্যটন হাব। দাবিগুলির প্রশাসনিক পথ আলাদা, বাস্তবতার স্তরও আলাদা। তবু তারা একই প্রশ্নে এসে মেশে: সীমান্ত অঞ্চলের যুবসমাজকে উন্নয়নের নকশায় কতটা দেখা হচ্ছে, আর স্লোগানের পরে নথি ও সময়সীমা কোথায় বাস্তবে?
ডিওয়াইএফআইয়ের ২০ সেপ্টেম্বরের কলকাতা সমাবেশের ঘোষিত কেন্দ্র শিল্প ও কাজের দাবি। দিনহাটা শহর লোকাল কমিটির দেওয়াল-লেখন সেই রাজ্য কর্মসূচিকে স্থানীয় প্রয়োজনের ভাষা দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রচারে স্থানীয় দাবি জুড়ে দেওয়া নতুন নয়। নতুন হতে পারে তখনই, যখন স্লোগানের সঙ্গে নথি, পরিসংখ্যান, দপ্তর এবং সময়সীমা জুড়ে যায়। জননীতি শেষ পর্যন্ত মাইকের আওয়াজে নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতায় বিচার হয়।
প্রথম খোলস উচ্চশিক্ষা।
কোচবিহার জেলা প্রশাসনের বর্তমান ব্লক-প্রোফাইলে দিনহাটা-II এবং সিতাই—দুই জায়গাতেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তালিকাভুক্ত নেই। দিনহাটা-II সম্পূর্ণ গ্রামীণ; সরকারি তথ্য অনুযায়ী তার সাক্ষরতার হার ৬৬.৫৭ শতাংশ।
সিতাইয়ের ক্ষেত্রেও নগর জনসংখ্যা শূন্য, সাক্ষরতার হার ৫৩.৪৭ শতাংশ; মহিলা সাক্ষরতা ৪২.১৭ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলি কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিজে থেকে দেয় না, কিন্তু উচ্চশিক্ষার প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রশ্নকে যথেষ্ট ওজন দেয়।
দিনহাটা কলেজ নিজেই জানায়, ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি মহকুমার প্রথম কলেজ এবং প্রধানত গ্রামীণ পটভূমির প্রথম-প্রজন্মের বহু শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা দেয়।
তাই দিনহাটা-II ও সিতাইয়ে নতুন কলেজের দাবি আবেগমাত্র হলে তা প্রমাণের দায়িত্ব আন্দোলনের; আর প্রয়োজন বাস্তব হলে তার feasibility study, সম্ভাব্য ছাত্রসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক চাহিদা ও জমির অবস্থান প্রকাশ করা সরকারের দায়িত্ব।
‘কলেজ চাই’ স্লোগানের পরের বাক্য হওয়া উচিত—কেন, কোথায়, কতজনের জন্য?
এখানে দূরত্বও কেবল মানচিত্রের হিসাব নয়। সম্পূর্ণ গ্রামীণ ব্লকে কলেজে যাতায়াতের অর্থ পরিবহণের খরচ, সময়, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এবং বিশেষ করে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
তাই নতুন কলেজের দাবি যাচাই করতে শুধু মোট আসন গুনলেই হবে না; কোথা থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসে, কত দূর যাতায়াত করে এবং কোন স্তরে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়—এই তথ্যও দরকার। তথ্য ছাড়া দাবি দুর্বল; তথ্য থাকলে প্রশাসনের নীরবতাই প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় খোলস স্টেডিয়াম।
দিনহাটায় পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়ামের দাবি অন্তত এক দশকেরও বেশি পুরনো। ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরসংলগ্ন পুঁটিমারিতে প্রায় ছয় একর জমি কেনা হয়েছিল; পাঁচিলের কাজও শুরু হয়ে পরে থেমে যায়।
আজ আবার দেওয়ালে ‘স্টেডিয়াম চাই’ উঠলে পুরনো ফাইলটির বর্তমান অবস্থাই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত। জমি আছে কি না, প্রকল্প জীবিত কি না, ব্যয়ের হিসাব কী—এসব না জেনে নতুন প্রতিশ্রুতি পুরনো বিস্মৃতিকে শুধু নতুন রং দেয়।
তৃতীয় খোলস গীতালদহ।
ভারত-বাংলাদেশ বিভাজনের আগে গীতালদহ–মোগলহাট–লালমনিরহাট রেলযোগ ছিল। ২০১৮ সালে লোকসভাতেও এই রুট পুনরুদ্ধারের দাবি উঠেছিল।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা বিষয়ক ২০২৪–২৬ কর্মপরিকল্পনায় বাংলাদেশ মোগলহাট–গীতালদহকে অতিরিক্ত সম্ভাব্য rail interchange point হিসেবে প্রস্তাব করেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দাবি ইতিহাসহীন নয়; আবার এটিকে অনুমোদিত প্রকল্প বলাও ভুল। এখানে কেন্দ্র, রেল, সীমান্ত নিরাপত্তা, বিদেশনীতি এবং বাংলাদেশের সম্মতি—সবই প্রয়োজন।
চতুর্থ খোলস গোসানিমারি।
রাজপাট কোনও বানানো পর্যটন-নাম নয়। কোচবিহার জেলা প্রশাসন গোসানিমারিকে পর্যটন মানচিত্রে রাখে, আর আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া রাজপাট সাইটকে কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত প্রত্নস্থল হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
এএসআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, খননে দশম-একাদশ শতক থেকে পরবর্তী সময়ের স্থাপত্য ও প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে।
ফলে ‘পর্যটন হাব’ মানে শুধু আলো, ফটক বা উৎসব নয়। সংরক্ষণ, ব্যাখ্যাকেন্দ্র, যোগাযোগ, স্থানীয় গাইড, পরিচ্ছন্নতা এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র অর্থনীতির সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এই চার দাবির মাঝখানে আসলে পঞ্চম দাবিটিই কেন্দ্র—কর্মসংস্থান।
কলেজ তৈরি হলে ভবন নয়, দক্ষতা ও কাজের সংযোগ কতটা তৈরি হবে? স্টেডিয়াম হলে প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা ও ক্রীড়া-অর্থনীতি থাকবে কি? আন্তর্জাতিক যোগাযোগ খুললে স্থানীয় পরিবহণ, বাণিজ্য ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থান কতটা তৈরি হতে পারে?
পর্যটন বাড়লে আয় কি স্থানীয় যুবক, গাইড, দোকানদার, পরিবহণকর্মী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার হাতে পৌঁছবে? প্রকল্পের মূল্য তার ফিতে কাটায় নয়, স্থানীয় জীবনে তার বহুগুণ প্রভাবে।
এখানেই আন্দোলনেরও পরীক্ষা।পাঁচটি দাবি এক মঞ্চে বলা যায়, কিন্তু পাঁচটির প্রশাসনিক দরজা এক নয়। কলেজ মূলত রাজ্যের উচ্চশিক্ষা নীতির প্রশ্ন; স্টেডিয়ামে রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা; গোসানিমারিতে পর্যটনের সঙ্গে প্রত্নসংরক্ষণ; গীতালদহে কেন্দ্রীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় অপরিহার্য।
দাবির ঠিকানা ভুল হলে স্লোগান জোরালো হয়, সমাধান নয়। আন্দোলনকে তাই প্রতিটি দাবির জন্য আলাদা নথি, কর্তৃপক্ষ ও পরবর্তী পদক্ষেপ চিহ্নিত করতে হবে।
আর একটি অভ্যাস জরুরি—দাবির স্মৃতি সংরক্ষণ।
আজ দেওয়ালে যে কথা লেখা হলো, ছয় মাস পরে তার অবস্থান কী, এক বছর পরে কোন দফতর কী উত্তর দিলো—সেটি প্রকাশ্যে রাখলে আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।
‘দাবি তোলা হয়েছিল’ আর ‘দাবির অগ্রগতি অনুসরণ করা হয়েছে’ এক বিষয় নয়। স্থানীয় রাজনীতিতে দ্বিতীয়টির অভাবই বহু প্রয়োজনকে বারবার নতুন স্লোগান বানিয়ে ফিরিয়ে আনে।
সরকারের কাজও পতাকার রং দেখা নয়।
বিরোধী যুব সংগঠন দাবি তুলেছে বলেই দাবি অযৌক্তিক হয়ে যায় না; আবার দেওয়ালে লেখা হয়েছে বলেই দাবিটি প্রস্তুত প্রকল্প হয়ে ওঠে না।
পরিণত প্রশাসন দাবিকে feasibility, budget, jurisdiction এবং timeline-এর ভাষায় উত্তর দেয়। পরিণত আন্দোলনও উত্তরের পরে ফাইলের গতিপথ অনুসরণ করে। দুই পক্ষের এই শৃঙ্খলাই রাজনৈতিক বক্তব্যকে জননীতিতে বদলাতে পারে।
দিনহাটার দেওয়ালে লাল রং চোখে পড়ে, কিন্তু সম্পাদকীয় চোখে আরও গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি প্রশ্নচিহ্ন।
২০ সেপ্টেম্বর কলকাতার মঞ্চে দাবিগুলি উচ্চারিত হলে তা রাজনৈতিক মুহূর্ত তৈরি করবে। আসল পরীক্ষা শুরু হবে তার পরদিন থেকে—কলেজের সমীক্ষা কোথায়, পুঁটিমারির জমির অবস্থা কী, গীতালদহের প্রস্তাব কোন স্তরে, গোসানিমারির পর্যটন পরিকল্পনা কী, আর কর্মসংস্থানের মাপ কী?
সীমান্তের যুবসমাজের দরকার আরেকটি স্লোগান নয়; প্রতিটি স্লোগানের পাশে একটি নথি, একটি দায়ী দপ্তর এবং একটি মাপযোগ্য সময়সীমা।
- #দিনহাটা #ইনকিলাবসমাবেশ #DYFI #কর্মসংস্থান #গীতালদহ #গোসানিমারি
- দিনহাটা ইনকিলাব সমাবেশ ২০২৬, DYFI Inquilab Rally, Dinhata College Demand, Sitai College, Dinhata Stadium, Gitaldaha Mogalhat rail link, Gosanimari Rajpat tourism, Dinhata employment

