অনলাইন শপিং শুরুর দিকে তখনও স্মার্টফোন সকলের হাতে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে উঠতে পারে নি। সেই সময় যারা দুরুদুরু বুকে অনলাইন শপিং করতেন তারা শপিং করার জন্য সে সময় মূলত যে site গুলো ব্যাবহার করতেন তার মধ্যে অন্যতম flipkart, amazon, ebay আর SNAPDEAL। যাত্রা শুরুর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই যে ই-কমার্স সাইট সেরার লরাইয়ে নিজেদের অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে এসেছিলো 26% মার্কেট শেয়ারের সাথে, তার নাম Snapdeal । কিন্তু হঠাৎ কী এমন ঘটলো যার জন্য Snapdeal নিজেদের অবস্থান তো হারালই তার সাথে আজ তারা অস্তিত্ব সংকটে।
আমি 2016 সালে আমার ল্যাপটপ Snapdeal থেকেই কিনেছিলাম কিন্তু তারপর ? তারপর আর মনে পড়ছে না শেষ কবে আমি Snapdeal থেকে শপিং তো দূরের কথা site টা just খুলে দেখেছিলাম । আপনারা বলতে পারেন শেষ কবে Snapdeal থেকে শপিং করেছিলেন ? চলুন তাহলে আজকে আলোচনা করি Spanpdeal এর উত্থান পতন নিয়ে আর শেষে এটাও জানাবো আজকে তাদের অবস্থান কী, পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে।
4th ফেব্রুয়ারি 2010 সালে Kunal Bahl ও Rohit Bansal-এর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে Snapdeal। শুরুতে Snapdel একটি কুপন বা Deal প্রদানকারী ওয়েবসাইট হলেও মাত্র এক বছরের মধ্যেই তারা ব্যাবসাটিকে আরও বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে নিজেদের Online Market Place হিসেবে ঘোষণা করে। এই সময় তাদের ব্যাবসার মূল উদ্দেশ্য ছিল কাস্টমারদের জন্য Value-For-Money প্রোডাক্ট প্রদান করা। তাই তারা শুরু থেকেই খুবই সস্তায় বিভিন্ন প্রোডাক্ট গ্রাহকদের হাতে তুলে দিতে থাকে। আর ঠিক সেই কারণেই Snapdeal এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে খুব দ্রুত। যাত্রা শুরুর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই Snapdeal ছড়িয়ে পড়ে ভারতের 92% ছোট ও মাঝারি শহরে । বাড়তে থাকা চাহিদাকে দেখে যুক্ত হয়ে যায় প্রায় 5,00,000 (5 লাখ) Retail Sellers। যা সেই সময়ে প্রচলিত অন্যান্য ই-কমার্স সাইটগুলোর মধ্যে সর্বাধিক। Snapdeal যখন তাদের সাফল্যের শিখরে ছিল তখন কোম্পানির ভ্যালুয়েশন ছিলো 6.5 বিলিয়ন ডলার যা ভারতীয় মুদ্রায় বর্তমান সময়ে প্রায় 50 হাজার কোটি টাকার আশেপাশে। Snapdeal এর বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে দেশী ও বিদেশী প্রচুর বড় বড় সংস্থা যেমন Soft Bank, Ebay, Nexus Venture ইত্যাদি কোম্পানি এবং স্যার রতন টাটা স্বয়ং এই কোম্পানিতে ইনভেস্ট করেছিলো। সেই সময় এমনও ধারণা করা হয়েছিলো, তৎকালীন ই-কমার্স মার্কেট লিডার flipkart কে যদি কেউ পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে সে হল Snapdeal।
কিন্তু Snapdeal এর এই গোল্ডেন পিরিয়ড শেষ হয়ে যায় সাল 2015 এর শেষের দিকে। ততদিনে Amazon নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে বসেছিল অনলাইন শপিং এর দুনিয়ায়। এবং পরবর্তী কালে সাল 2017 আসতে আসতে Amazon হয়ে ওঠে মার্কেটের নতুন লিডার আর Snapdeal নিজেদের সর্বস্ব খুইয়ে সাল 2017 র শেষে 26% থেকে মাত্র 4% (চার শতাংশ) মার্কেট শেয়ার নিয়ে ই-কমার্সের দুনিয়া থেকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার প্রহর গুনতে থাকে। একদা দ্বিতীয় স্থানে থাকা কোম্পানি কেন নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে নি? কী ছিলো Snapdeal এর ফাউন্ডারদের ভুল যার জন্য এতো বড় কোম্পানি প্রায় ধুলোয় মিশে যাচ্ছিলো? Snapdeal 2.0 কি? Snapdeal কি কখনো পুনরায় তাদের অতীত জৌলস ফিরে পাবে? আবার কি পারবে অনলাইল শপিং দুনিয়ার মূল দুই মহারথী ফ্লিপকার্ট আর Amazon এর সাথে চোখে চোখ রেখে সামনে এসে দাঁড়াতে............ চলুন এসব নিয়েই এবার আলোচনা করা যাক।
Flipkart ও Amazon শুরু থেকেই চেষ্টা করে আসছিলো কাস্টমারদের বেস্ট কোয়ালিটি প্রোডাক্ট প্রদান করার। পাশাপাশি Snapdeal সস্তা প্রডাক্টের চক্করে কখনো কোয়ালিটি মেইনটেন করতেই পারে নি। যার জন্য বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তারা নিম্নমানের অথবা ড্যামেজ প্রোডাক্ট গ্রাহকদের হাতে তুলে দিয়েছিলো। এমনও অভিযোগ আসছিলো যে Snapdeal ব্রান্ডেড কোম্পানির ডুপ্লিকেট প্রোডাক্ট কাস্টমারদের বিক্রি করেছে। তার ফলে গ্রাহকদের পাশাপাশি বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি Snapdeal-এর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলো। এর সাথে শুরুর দিকে তাদের রিটার্ন পলিসিও ছিলো বেশ জটিল। অনেকক্ষেত্রে কাস্টমারদের প্রডাক্ট রিটার্ন করতে প্রচুর হয়রানির শিকার হতে হতো। ফলে Snapdeal বরাবরই গ্রাহকদের মনে বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে পারছিলো না।
সময়ের সাথে সাথে Amazon ও Flipkart নিজেদের ওয়ার হাউস গড়ে তলে, এবং সেখানে তারা বিভিন্ন ব্রান্ডেড প্রোডাক্ট স্টোর করে নিজেরাই সেগুলো সেল করতে থাকে। ফলে কোয়ালিটি কন্ট্রোল খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হয়েছিলো এই দুই কোম্পানি। কিন্তু Snapdeal চিরকালই বিভিন্ন রিটেলারদের কাছ থেকেই প্রোডাক্ট নিয়ে তা কাস্টমার পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছিল। ফলে কোম্পানি কখনই প্রডাক্টের ওপর নিজরদারি করতে সক্ষম হচ্ছিলো না। একটা সময়ে তাদের প্রোডাক্ট সম্পর্কে এতো অভিযোগ আসছিলো যে কোম্পানি সেই সমস্ত অভিযোগ দেখতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিলো। ফলে গ্রাহক অসন্তোষ আরও বাড়তে থাকে এবং কোম্পানির নামে প্রচুর গ্রাহক মামলা করে দিয়েছিলো।
বিজনেস মডেলেও Snapdeal বেশ পিছিয়ে ছিলো বাকি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার জন্য flipkart ও Amazon যখন বড় বড় সংস্থার সাথে Deal করছিলো, Snapdeal তখন সেরকম কোন উদ্যগ নেয় নি। ফলে Flipkart ও Amazon এ প্রায়ই বিভিন্ন এক্সক্লুসিভ মোবাইল ডিল নিয়ে আসছিলো তাদের গ্রাহকদের জন্য। ফলে মূলত snapdeal এর গ্রাহকরা এসে ভীর করতে থাকে Amazon-এ। এর সাথে বিগ বিলিয়ন ডে বা গ্রেট ইন্ডিয়ান ফেস্টিভ্যাল-এর মতো অফারগুলোও গ্রাহকদের মনে এই দুই কোম্পানির জন্য আলাদা জায়গা করে নেয়। কিন্তু Snapdeal এর সেরকম কোন অফার গ্রাহকদের মনে দাগ কাটতে পারেনি।
Snapdeal এর মালিকপক্ষের আগাগোড়াই কোন নির্দিষ্ট লক্ষ ছিল না। কখনো তারা হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিলো মার্কেট লিডার, কখনো বা সবচেয়ে সস্তা প্রোডাক্ট বিক্রেতা। যার ফলে Snapdeal নিজেদের ইউনিক পরিচিতি লাভ করতে পারেনি কোন কালেই। এমনকি Flipkart যেমন ফ্যাসান সেগমেন্টে নিজেদের মজবুত ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছিল আর amazon সেরকমই ইলেকট্রনিক্স সেগমেন্টে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে কিন্তু Snapdeal কোন সেগমেন্টেই নিজেদের সুনাম অর্জন করতে পারে নি।
শুরু থেকেই কোম্পানি এতো বেশী অফার দিচ্ছিল গ্রাহকদের ফলে Snapdeal শুরু থেকেই একটি নন-প্রফিটেবল কোম্পানি ছিল। সাল 2016-তে যখন তাদের কাছে মাত্র 400 কোটি টাকার আশেপাশে ফান্ড অবশিষ্ট ছিল তখন কোম্পানি নিজেদের নতুন লোগো, নতুন থিম নিয়ে মার্কেটে হাজির হয়। তারা বিখ্যাত বলিউড অভিনেতা আমির খানকে সেসময় ব্রান্ড অ্যাম্বাসিডর হিসেবে নিয়োগ করে এবং তাদের নতুন স্লগান “Unbox Zindegi” এর সাথে তারা একটি নতুন পথ চলা শুরু করে। তাদের নতুন এই ভার্সন যা কিনা Snapdeal 2.0 নামে নিজেদের রি-ব্রান্ডিং করে কোম্পানি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমির খান একটি কন্ট্রোভার্সিতে জড়িয়ে পরেন। অনেকের দাবি ছিল নিজের দেশকে “অসহিষ্ণু” বলেছেন আমির খান। যার জন্য আমির খান বিরোধী একটা বাতাবরণ সৃষ্টি হয় দেশজুড়ে এবং বয়কর Snapdeal এর একটি ডাক দেয় বেশ কিছু মানুষজন। ফলে Snapdeal এর এই বিপুল অর্থবিনিয়োগ পুরটাই বিফলে চলে যায়। Snapdeal এই সময় এততাই ডুবে যায় যে তাদের কর্মচারিদের বেতন দিতেও তারা হিমশিম খেতে শুরু করে। ফলে তারা কস্টকাটিং করতে মার্কেটিং বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যার ফলে তাদের সেলস একেবারেই জিরোতে নেমে যায়। ফলে কোম্পানি আরও লসে ডুবে যায়। এই সময় কোম্পানির অনেক কর্মচারী Snapdeal ছেড়ে চলে যেতে থাকে, ফলে ব্যাবসা কিছুতেই সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিলো না মালিক পক্ষের দ্বারা।
Snapdeal আরও যেসব ভুল করেছিলো তার মধ্যে অন্যতম হল Flipkart যেমন PhonePe কে কিনে নিয়ে নিজেদের পেমেন্ট সিস্টেম স্ট্রং করেছিলো সেরকমই Snapdeal ও Freecharge কে কিনে নিয়েছিলো অনেক ওভার ভ্যালুয়েশনে। প্রায় 30 হাজার কোটি টাকা দিয়ে Freecharge কে কিনে নিয়েছিলো Snapdeal যা পরবর্তীকালে মাত্র 400 কোটি টাকার বিনিময়ে Axis Bank এর কাছে বিক্রি করে দিতে হয়েছিলো।
এতো কিছুর পরও Flipkart Snapdeal কে অফার দিয়েছিলো মাত্র 400 কোটি টাকায় তারা Snapdeal কে কিনতে চায়। Snapdeal এর প্রতিষ্ঠাতারা হয়তো অফারে রাজীও হয়ে যেতো কিন্তু তারা যখন বুঝতে পারে flipkart এর মালিকপক্ষের কোন সূদুরপ্রসারী বিজনেস পরিকল্পনা নেই। তাদের প্লান ছিল flipkart কে ওভার ভ্যালুয়েশনে কোন বিদেশী সংস্থার কাছে বিক্রি করে দিয়ে নিজেরা সুখের জীবন কাটাবে, তখন Snapdeal কতৃপক্ষ পিছিয়ে আসে কারণ তারা জানতো এতো বড় কোম্পানি বিদেশী সংস্থার হাতে তুলে দিলে দেশ ও কর্মচারীদের কতটা ক্ষতি হবে। Snapdeal কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের জন্য তাদের প্রতি শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে যায়।
তবে সবশেষে একটা আশার আলো এই যে, FY 2017 এর তুলনায় FY 2019 এ Snapdeal এর লস প্রায় 90% কমে গিয়েছে। সাল 2017 তে কোম্পানির যেখান প্রায় 5000 কোটি টাকার লস ছিলো, সাল 2019 এ তা এসে দাঁড়ায় মাত্র 200 কোটি টাকায়। এবং Snapdeal এখন ধীরে ধীরে লাভবান হওয়ার পথে রয়েছে। শুধু লসই কম হয়নি পাশাপাশি সাল 2018 থেকে 2020 পর্যন্ত তারা প্রচুর নতুন নতুন গ্রাহকে তাদের প্লাটফর্মে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। FY2018 তে তারা 90 লক্ষ নতুন গ্রাহক Snapdeal পরিবারের সাথে যুক্ত হয়েছেন। আর FY 2020 এ সেই সংখ্যাটা 3 কোটির কাছাকাছি। খুব শিগগিরই Snapdeal ভারতীয় স্টক মার্কেটেরও অংশ হতে চলেছে বলে দাবী করেছেন Snapdeal কর্তৃপক্ষ।
Snapdeal এর এই উত্থান পতন আমাদের অনেক কিছু শেখায়। মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েও হার না মানার জেদ কীভাবে আবার সফলতার দিকে নিয়ে যায় তা আমরা শিখতে পারি Snapdeal কে দেখাই। অনেক অনেক ভালোবাসা রইলো Snapdeal এর আগামীদিনের জন্য। যে নিজের দেশ ও কোম্পানির সাথে যুক্ত প্রত্যেকের কথা ভেবে লস স্বীকার করেও লড়াই করার মানসিকতা দেখায় তাদের সাফল্য কে না চাইবে। আগামীদিনে ভারতীয় কোম্পানি হিসেবে Snapdeal হয়ে উঠুক অনলাইন শপিং বা ই-কমার্স বিজনেসের নতুন মার্কেট লিডার।
0 Comments