![]() |
| সংবাদপত্র ডিজিটাল নিউজ ডেস্ক,১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: রবিবার বৃষ্টিভেজা ভোরে প্রায় পাঁচটা নাগাদ প্রশাসনিক নিরাপত্তায় সিতাইয়ের বাড়িতে ফিরলেন কোচবিহারের সাংসদ জগদীশ চন্দ্র বর্মা বসুনিয়া। গত কয়েক মাসে তাঁর বাড়ি ফেরার চেষ্টা একাধিকবার রাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ১০ অগস্ট রাতেও এসেছিলেন, কিন্তু বিক্ষোভের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চলে যেতে হয়। এবার তাঁর ফেরা তাই নিছক ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়। আগের দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ঘটনাটিতে আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য যোগ করেছে। |
জগদীশ বসুনিয়ার সঙ্গে সিতাইয়ের সম্পর্ক নির্বাচনী রাজনীতির বহু বছরের। ২০১৬ এবং ২০২১—দুই বিধানসভা নির্বাচনে তিনি তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে সিতাই থেকে জয়ী হন। ২০২১ সালে তিনি ১,১৭,৯০৮ ভোট পেয়ে বিজেপির দীপক কুমার রায়কে ১০,১১২ ভোটে হারান। ২০২৪ সালে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিটে তাঁর উত্থান আরও বড় হয়। ৭,৮৮,৩৭৫ ভোট পেয়ে তিনি বিজেপির নিশীথ প্রামাণিককে ৩৯,২৫০ ভোটে পরাজিত করেন। সরকারি নির্বাচনী নথিতেও তাঁর সেই জয় রয়েছে। অর্থাৎ সিতাই তাঁর বাড়ি যেমন, তেমনই দীর্ঘ রাজনৈতিক ভিত্তিরও কেন্দ্র।
সাংসদ হওয়ার পর কোচবিহার-সংক্রান্ত একাধিক বিষয় সংসদে তুলেছেন বসুনিয়া। কোচবিহার স্পোর্টস হাব, কোচবিহার প্যালেসের সংরক্ষণ, বিমানবন্দরের পরিষেবা এবং সড়ক পরিকাঠামোর মতো বিষয় তাঁর সংসদীয় হস্তক্ষেপে এসেছে। ফলে তাঁকে কেবল সাম্প্রতিক দলীয় টানাপড়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে সাংসদ হিসেবে তাঁর ভূমিকার একটি অংশ আড়াল হয়ে যায়। তবে সংসদীয় সক্রিয়তা এবং নিজের নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত প্রত্যক্ষ উপস্থিতি এক বিষয় নয়। গত কয়েক মাসে সিতাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ সেই পার্থক্যকেই সামনে এনেছে।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসে। তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের সঙ্গে তিনি NCPI-ঘনিষ্ঠ অবস্থান নেন এবং NDA-র প্রতি সমর্থনের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হন। বিদ্রোহী সাংসদেরা NDA-র সংসদীয় বৈঠকেও যোগ দিয়েছেন। তবু তাঁর সংসদীয় দলীয় অবস্থানের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। সরকারি তালিকায় তাঁর সঙ্গে এখনও All India Trinamool Congress-এর পরিচয় রয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল বিদ্রোহী সাংসদদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইনে অযোগ্যতার আবেদন করেছে। ফলে রাজনৈতিক অবস্থান এবং আনুষ্ঠানিক সংসদীয় পরিচয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান এখনও রয়েছে।
সিতাইয়ের মাটিতে সমস্যাটি আরও প্রত্যক্ষ। জুনের শেষ সপ্তাহে কোচবিহারে ফেরার পরও বিক্ষোভের আশঙ্কায় তিনি সিতাই পৌঁছতে পারেননি বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ১০ অগস্ট রাতে জগদীশ এবং তাঁর স্ত্রী, সিতাইয়ের বিধায়ক সঙ্গীতা রায়, বাড়িতে ফিরেছিলেন। তাঁদের ফেরাকে ঘিরে বাড়ির সামনে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং রাতের মধ্যেই তাঁরা এলাকা ছাড়েন। জগদীশ তখন জানিয়েছিলেন, তাঁর উপস্থিতির কারণে এলাকার শান্তি বিঘ্নিত হোক তিনি চান না। সেই ঘটনা দেখিয়েছিল—প্রশাসনিকভাবে বাড়িতে পৌঁছনো এবং রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক উপস্থিতি পুনরুদ্ধার এক বিষয় নয়।
এখানে ২০২৬-এর সিতাই বিধানসভা ফল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের ফল অনুযায়ী, সঙ্গীতা রায় ১,২৮,১৮৮ ভোট পেয়ে বিজেপির আশুতোষ বর্মাকে মাত্র ২,৭২১ ভোটে হারান। দুই প্রধান প্রার্থীর ভোটের অংশ ছিল যথাক্রমে ৪৮.৩১ এবং ৪৭.২৯ শতাংশ। ফলটি দেখায়, সিতাইয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কতটা তীব্র হয়েছে। তবে নির্বাচনী ফল থেকে কোনও ব্যক্তিগত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না; এটি রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের একটি পরিমাপ মাত্র।
পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট হয় ২০২৪-এর উপনির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে। জগদীশ লোকসভায় নির্বাচিত হওয়ার পরে তাঁর বিধায়ক পদত্যাগে শূন্য হওয়া সিতাই আসনে সঙ্গীতা রায় ১,৬৫,৯৮৪ ভোট পেয়ে বিজেপির দীপক কুমার রায়কে ১,৩০,৬৩৬ ভোটে হারিয়েছিলেন। সেই বিপুল ব্যবধান ২০২৬-এর সাধারণ বিধানসভা নির্বাচনে ২,৭২১ ভোটে নেমে আসে। দুই নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ছিল না, তাই এর থেকে সরাসরি কোনও কারণ-ফল সম্পর্ক টানা যাবে না। কিন্তু সিতাইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা যে আমূল বদলেছে, সংখ্যাগুলি তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
শনিবার সকালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বসুনিয়ার সৌজন্য সাক্ষাৎও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। বসুনিয়া সেই সাক্ষাতের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। তার পরদিনই তাঁর সিতাইয়ের বাড়িতে ফেরা স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক কৌতূহল বাড়িয়েছে। তবে দুটি ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে কোনও গোপন রাজনৈতিক চুক্তি বা বিশেষ প্রশাসনিক নির্দেশের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো দায়িত্বশীল হবে না। শুভেন্দুর সঙ্গে বিদ্রোহী সাংসদদের রাজনৈতিক যোগাযোগ আগেই প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে শনিবারের সাক্ষাৎকে আপাতত সেই ধারাবাহিক যোগাযোগের অংশ হিসেবেই দেখা যুক্তিসঙ্গত।
রবিবারের প্রত্যাবর্তনের আসল গুরুত্ব তাই অন্য জায়গায়। একজন নির্বাচিত সাংসদ নিজের বাড়ি ও নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত থাকতে পারবেন—এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রত্যাশা। একইসঙ্গে মানুষের প্রতিবাদ, অসন্তোষ এবং প্রশ্ন তোলার অধিকারও রয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্ব এই দুই অধিকারের মাঝখানে নিরপেক্ষভাবে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক নিরাপত্তা তাই এই ঘটনার একটি প্রয়োজনীয় বিবরণ, কিন্তু রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার বিকল্প নয়।
জগদীশ বসুনিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত দিল্লি বা কলকাতায় নয়—সিতাইয়ে। তাঁর দলীয় অবস্থানের নিষ্পত্তি হবে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এবং নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কও ক্রমে স্পষ্ট হবে। কিন্তু নিজের এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হলে নিয়মিত উপস্থিতি, প্রত্যক্ষ সংলাপ এবং প্রশ্নের জবাবদিহিই হবে প্রধান পথ। শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ রাজনৈতিক যোগাযোগের বার্তা দিতে পারে, প্রশাসনিক নিরাপত্তা তাঁকে বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্বাভাবিকতা তৈরি হবে তখনই, যখন মতভেদ বজায় রেখেও জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক—উভয় পক্ষ সংঘাত ছাড়া নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
