রামকৃষ্ণ চ্যাটার্জী, আসানসোল : সুন্দরবন রহস্যে রোমাঞ্চে ভরা। এই বন নিয়ে রয়েছে অনেক কথা। এই সুন্দরবনের মধ্যেই রয়েছে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়াল বেঙ্গল টাইগার। পাশাপাশি এই সুন্দরবনের মধ্যে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাদাবন বা ম্যানগ্রোভ অরণ্য। আর এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যই বারে বারে রক্ষা করেছে ওই অঞ্চলকে। কিন্তু ২০০৭ সালে সিটর নামক এক ঘূর্ণিঝড়ের জেরে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওই বনাঞ্চলটি। আর সেই ক্ষত সরিয়ে ওঠার আগেই ২০০৯ সালে সুন্দরবনের উপর দিয়ে বয়ে যায় আইলা নামক একটি ঘূর্ণিঝড়। যার জেরে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওই বনের ম্যানগ্রোভ। আর তার পরেই ২০২০ সালের আমফন ও ২০২১ সালের ইয়াস নামক ঘূর্ণিঝড় তছনছ করে দেয় গোটা সুন্দরবনকে। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে ওই বনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদেরা। আর এবার সেই ম্যানগ্রোভ বাঁচাতে সুন্দরবনের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এলো আসানসোল শিল্পাঞ্চল। হ্যাঁ আর ত্রাণ নয়, ম্যানগ্রোভ বাঁচানোর আন্দোলনে সামিল হতেই এগিয়ে এসেছে আসানসোলের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। আসানসোলের বার্নপুরের নববিকাশ নামের ওই সংস্থা ও আসানসোল পৌর নিগমের যৌথ ভাবে সুন্দরবনের ঝড়খালির সবুজ বাহিনীর মহিলাদের পাশে দাঁড়াল তাদের। জানা গেছে পুজোর মুখে সবুজ বাহিনীর ২০০ জন সদস্যার জন্য নতুন শাড়ি ও পড়ুয়াদের জন্য ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে তাঁরা। পাশাপাশি রবিবার তারা ঝড়খালিতে মাতলার পরিত্যক্ত চড়ে লাগাবেন ম্যানগ্রোভের চারা। আর তাই শনিবারই ঝড়খালীর উদ্যেশে রওনা হলেন বার্নপুরে নববিকাশের সদস্যরা।
সুন্দরবন আর তার পাশে ম্যানগ্রোভ। এই ম্যানগ্রোভ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ফের ইয়াসের সময় টের পেয়েছে সুন্দরবনবাসী। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ম্যানগ্রোভ রোপণের উপরে জোর দেওয়া হয়েছে এবার। তাই এবার মাতলা নদীর পরিত্যক্ত চরে রোপণ করা হচ্ছে ২ লাখ ম্যানগ্রোভের চারা। মাতলা অঞ্চলের ২০০ মহিলা বিনা পারিশ্রমিকে রোপন করছেন বিভিন্ন প্রজাতির ১০ হাজার ম্যানগ্রোভের বীজ। তাদের মধ্যে রয়েছে সুন্দরবনের গরান,হেতাল, কেওড়া, সুন্দরি, ধুন্দল,খলসি,তরা সহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১০ হাজার বীজ রোপণ করছেন 'ম্যানগ্রোভ প্রমিলা বাহিনী'র সদস্যরা। এদিন বার্নপুরের ওই ক্লাব কর্তাদের দাবি, ম্যানগ্রোভকে ভালোবেসে প্রমিলা বাহিনী ম্যানগ্রোভ বীজ রোপণের কাজে এগিয়ে এসেছেন। যেহেতু এই বীজ রোপণের কাজে তারা কোন মজুরি নিচ্ছেন না। বাড়ির কাজকর্ম সেরে অবসর সময়ে এই সমস্ত মহিলারা এগিয়ে এসেছেন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে এবং ভূমিক্ষয় রোধের জন্য। তাই তাঁদের পাশে এক অরণ্য ভালোবাসা নিয়েই পৌঁছাতে চাই আমরা। সুন্দরবান বাঁচানোর যে বার্তা তাঁরা দিয়েছে। তাঁদের সঙ্গে সামিল হয়ে তাদের সেই স্বপ্নকে পৌঁছে দিতে চায় এই স্বেচ্ছাসেবী ক্লাবটি।
প্রসঙ্গত এর আগেও করোনার প্রকোপে লকডাউনে রাজ্য জুড়ে ত্রানের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল বার্নপুরে এই ক্লাবের সদস্যদের। তাঁরাই প্রথম পুজোয় বাজেট কাটছাট করে কোভিড রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সেই সময়। সামাজিক বার্তা দিতে ফুটবল টুর্ণামেন্টে, সুন্দরী, গোরানের ম্যাসকট বানিয়ে নজর করেছিলেন রাজ্যের। পাশাপাশি এবছরের মে মাসে ইয়াস বিধ্বস্ত সুন্দরবনবাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন ত্রাণ সামগ্রী। আর এবার ম্যানগ্রোভ রোপন আন্দোলনেও সামিল হলেন বার্নপুরের নববিকাশ নামক ওই সংস্থাটি। এই কাজে তাদের সহযোগিতা করেছেন আসানসোল পুরনিগমের পুরপ্রশাসক অমরনাথ চট্টোপাধ্যায় ও বিধায়ক তথা এডিডিএ চেয়ারম্যান তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার এমনি জানান নববিকাশ ক্লাবের সম্পাদক বাপ্পা তালুকদার। অন্যদিকে এদিন ওই ক্লাবের সদস্য রূপক সরকার বলেন শুধু ত্রাণ দিলেই চলবে না চাই ঝড়ের হাত থেকে সুন্দরবনবাসীর একটা একটা স্থায়ী সমাধান। তিনি আরও বলেন আজ সুন্দরবন ছিল বলেই আমাদের কলকাতা বার বাড়ই রক্ষা পাচ্ছে আমফন ও ইয়াসের মতো বড় ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে। পাশাপাশি তিনি আরো বলেন আমাদের পাশাপাশি অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গুলিরও উচিত এই সময় ম্যানগ্রোভের চারা লাগানো সুন্দরবনে।

0 Comments